News Trends of India

ইতিহাসের পাতায় মিগ-২১

Debasish Bhattacharya
Debasish Bhattacharya/
৭৮জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
Share:
ইতিহাসের পাতায় মিগ-২১

কয়েকটি প্রজন্মের যৌবন-ঘাম-আত্মত্যাগ ও বীরত্বের প্রতিচ্ছবি

দেবাশিস ভট্টাচার্য: চিরদিনের জন্য ইতিহাসের পাতায় চলে গেল মিগ-২১। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ চন্ডিগড় এয়ারবেসে এক বর্ণাঢ্য বিদায় অনুষ্ঠানে মধ্যে দিয়ে ভারতের সামরিক ইতিহাসে একটা যুগের অবসান হলো। ভারতীয় বায়ুসেনার দুটি স্কোয়াড্রন ২৩ নম্বর প্যান্থারাস ও ৩ নম্বর কোবরাস আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাবে বায়ুসেনার মিগ ২১ এয়ারক্রাফট কে। ২৫ আগস্ট দেশের পশ্চিম সীমান্তে রাজস্থানের থর মরুভূমির ধুধু বালুতটে বিকানের শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে নাল এয়ারবেস থেকে উড়ে গেল মিগ ২১ বাইসনের শেষ উড়ান। তপ্ত টার্মাক থেকে যতদূর দেখা যায় ধীরে ধীরে আকাশে মিলিয়ে গেল মিগ২১ আফটার বার্নারের আগুনের লাল বিন্দু, মিলিয়ে গেল ৬০ বছরের দেশের আকাশ রক্ষার তীব্র গর্জন। এটিই ছিল মিগ ২১ বাইসনের শেষ উড়ান। ছয় দশকের সঙ্গীকে বিদায় জানাতে সারবেঁধে দাঁড়িয়েছিলেন টেকনিশিয়ান, পাইলট, অফিসাররা। যেন পরিবারের একজন সদস্যকে চিরতরে হারানোর মুহূর্ত। এই শেষ উড়ানের ককপিটে ছিলেন এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং, আর তার সাথে আরেকটি মিগ ২১ আকাশে তাকে এসকর্ট করেন স্কোয়াড্রন লিডার প্রিয়া শর্মা। ভারতীয় বায়ুসেনার সাহসী নারী ফাইটার পাইলট। এই দৃশ্য শুধু এক যুদ্ধবিমানের যুগের অবসান নয় বরং আগামী দিনে ভারতীয় নারী পাইলটরা তারা তাদের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার অঙ্গীকার নিল। প্রতীকী ভাবে প্রমাণ করলেন নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে ভারতীয় বায়ুসেনা প্রস্তুত।এয়ার চিফ মার্শাল এপিসিং এ নেতৃত্বে শেষ উড়ান শুধু প্রযুক্তির বিদায় নয় এক যুগের বিদায়ও বটে। মিগ ২১ শুধু একটা যুদ্ধবিমান নয়, এটি কয়েকটি প্রজন্মের যৌবন, ঘাম, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের প্রতিচ্ছবি। টেকনিশিয়ানদের অসংখ্য নির্ঘুম রাত, পাইলটদের ঝুঁকিপূর্ণ মিশন, সবমিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছিল ভারতীয় বায়ুসোনার সঙ্গে জড়ানো এক কিংবদন্তি।


দীর্ঘ ১৫ বছর জড়িয়ে ছিলাম এই মিগ ২১ এর সঙ্গে। পাঠানকোট চন্ডিগড় বেরেলী জামনগর সহ সমগ্র পশ্চিম ভারতের সীমানায় শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় সঙ্গী ছিলাম। ১ থেকে ২ ডিগ্রি টেম্পারেচার শীতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় ঘন কালো অন্ধকার হোক বা মরুভূমির তপ্ত বালির ওপর চাঁদিফাটা রোদ্দুরে মাইলের পর মাইল সাইকেল চালিয়ে গেছি রানওয়ের ধারে এই মিগ ২১কে আকাশে ওড়ার জন্য সাজিয়ে তুলতে। রানওয়ের ধারে ওৎ পেতে থাকা আধুনিক মিসাইল অস্ত্রে সুসজ্জিত এই মিগ২১ স্ক্র্যাম্বেল অর্ডার পেয়ে দু মিনিটের মধ্যে আকাশে টেক অফ করে গেছে। মনে মনে বলেছি জয়যুদ্ধে যাও গো, শত্রুর সম্পূর্ণ মোকাবিলা করে ফিরে আসো। টেকনিশিয়ান এর ওভারঅল পড়ে দিনরাত কেটে গেছে ওই রানওয়ের ধারে। যে সমস্যাই আসুক তার সমাধান করতেই হবে। বহু বাধা এসেছে দিনের পর দিন জটিল সার্কিট ডায়াগ্রাম নিয়ে কাটিয়েছি, গ্রীষ্মের অনেক অলস দুপুর কেটে গেছে এর ডানার নিচে বসে, নিজের হাতে পরিষ্কার করেছি এর এয়ারফ্রেমের ধুলো ময়লা।

আমাদের সে এক প্রেম ছিল এই যন্ত্রের সাথে। কত গভীর রাতে বাড়ি ফিরে এসেছি, বাড়িতে পরিবার থাকতো অপেক্ষায়। কত ছুটি নষ্ট হয়ে গেছে তাতে কারোর ভ্রুক্ষেপ ছিল না। একটাই লক্ষ্য ছিল এই এয়ারক্রাফ্টকে অপারেশনাল ফিট রাখতে হবে। মিগ ২১ এর প্রতিটি অংশে থাকতো স্নেহের পরশ। তীক্ষ্ণ নজর থাকত, এতটুকু এদিক ওদিক চোখ এড়াত না। পাইলট যেমন বলে আফটারবার্নারের জার্ক না অনুভব করলে মনে হয় সারাদিন কিছু হয়নি ঠিক তেমনি এর এই কর্ণভেদী শব্দ মরমে না পশিলে মনে হতো দিনটাই বৃথা গেল। কত কিছু দেখেছি সে সময়ে। কত কিছু শিখেছি। রাশিয়ান ভাষার বর্ণমালা শিখেছি। নতুন প্রযুক্তির আসা, তার কর্মক্ষমতা, দক্ষতা সবই চাক্ষুস করেছি প্রতি পদে। স্মৃতি মেদুরতায় আজও মনে পড়ে তিনটে মিগ২১ এয়ার ক্র্যাশের কথা যার মধ্যে দুজন পাইলটের মৃত্যু। স্বজনহারানোর শোক পেয়েছিলাম।


ভারতীয় বায়ুসেনার ইতিহাসের ৬০ বছরের এক যুগের অবসান ঘটতে চলেছে। ১৯৫৫ সালের ভ্যালেন্টাইন্স ডে তদানিন সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রথম পরীক্ষামূলক উড়ান শুরু করে মিগ২১। ১৯৬৩ সালে প্রথম ব্যাচ হিসেবে মোট বারোটি মিগ ২১ ফাইটার জেট রাশিয়া থেকে ভারতীয় বায়ুসেনায় যুক্ত হয়। সেই থেকেই শুরু হয় ভারতীয় বায়ুসেনার সুপারসনিক প্রেমের গল্প। ধীরে ধীরে মিগ ২১ হয়ে ওঠে ভারতীয় আকাশ প্রতিরক্ষার মেরুদন্ড। মিগ ২১ ফাইটার ১৯৬৫, ১৯৭১ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে অংশগ্রহণ, পাকিস্তানের স্টার ফাইটার কে ভূপাতিত করা, ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘাত এমনকি ২০১৯ সালের বালাকোট পরবর্তী অভিযানে এই বিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গ্রুপক্যাপ্টেন অভিনন্দন বর্তমান যখন মিগ ২১ বাইসন নিয়ে পাকিস্তানের এফ ১৬ ধ্বংস করেছিলেন তখন সারাদেশ আবেগে ভেসে ছিল। এই সাফল্য প্রমাণ করে বয়স বাড়লেও দক্ষতার সামনে আধুনিকতার ঝলক স্ম্লান। প্রায় ৮৭০ র বেশি মিগ ২১ এক সময় ভারতের হাতে ছিল। যার মধ্যে ৬০০ দেশেই তৈরি হয়েছে। আপগ্রেডেড রাডার, অ্যাভিওনিক্স ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার ও সংযোজন এই বিমানটি বারবার নতুন জীবন দিয়েছে। মিগ ২১ এফ এল, এম এফ, সবশেষে মিগ২১বাইসন নাম নিয়ে ৬২ বছর সক্রিয় থেকেছে। তবে সাফল্যের পাশাপাশি ছিল তিক্ত অভিজ্ঞতাও। প্রায় ৪০০র বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে, প্রাণ হারিয়েছে ২০০ পাইলটের, ৬০ জন সাধারণ মানুষের। শত শত দুর্ঘটনা অসংখ্য প্রান ই শেষ পর্যন্ত এই বিমানকে কুখ্যাতি নাম দিয়েছিল “ফ্লাইং কফিন”। হয়েছিল অনেক বিতর্ক, দীর্ঘ সময় গ্রাউন্ডেড থেকেছিল, আবার স্বমহিমায় যাত্রা শুরু করেছিল। শত সমালোচনার মাঝেও ভারতের আকাশ রক্ষায় এক দীর্ঘ সময় ধরে কাঁধে তুলে নিয়েছিল মিগ২১। বায়ুসেনার মুখপাত্র উইং কমান্ডার জয়দীপ সিং বলেন বিশ্বের আর কোন বিমানবাহিনী এত দীর্ঘ সময় ধরে মিগ২১ কে কার্যকর হিসেবে ব্যবহার করেনি। বাস্তবতা হলো মিগ ২১ এর সময়কাল ছিল ৩০ বছর । পরিবর্তিত যুদ্ধবিমান ক্রয়ে দেরি, সরকারের মনোভাব, অর্থের অভাব আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিমান বাহিনীকে বহুদিন ধরে এই বিমান চালাতে বাধ্য করা হয়েছে। যদিও বিকল্পের অভাবে এবং দক্ষতার প্রমাণে মিগ ২১ দশকের পর দশক ধরে দেশের আকাশকে নিরাপদ রেখেছিল।

অন্যতম সর্বাধিক উৎপাদিত সুপারসনিক জেট বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে ১১ হাজারের বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে দেশীয় তেজস এম কে ওয়ান এ এবং ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমান ভারতীয় আকাশ সীমার সুরক্ষার ভার নিচ্ছে। ভবিষ্যতে পঞ্চম প্রজন্মের দেশীয় যুদ্ধ বিমান যুক্ত হবে বায়ুসেনার বহরে। আধুনিক প্রযুক্তির পথে এগোলেও ভারতীয় আকাশ রক্ষা ইতিহাসে মিগ ২১ কিংবদন্তী হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় থাকবে। ২৬ শে সেপ্টেম্বর তাই কেবল ক্যালেন্ডার এর একটি তারিখ নয় এটি এক ঐতিহাসিক দিন। ঐতিহাসিক বিদায় সম্বর্ধনায় শেষ হবে আকাশপ্রহরীর ইতিহাস যা বায়ুসেনার সাফল্য ও আবেগ। আর কোনদিন মিগ ২১ আকাশে উড়বে না, কিন্তু তার গর্জন তার স্বপ্নের উড়ান তার সিলুয়েট শত শত পাইলট টেকনিশিয়ানদের হৃদয়ে গাঁথা থাকবে। অমর হয়ে থাকবে ৬২ বছরের আকাশ প্রহরীর প্রেমের গল্প। মিগ২১ চিরকাল সামরিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। গুড বাই মিগ২১।

ইতিহাসের পাতায় মিগ-২১ | News Trends of India