প্রথম দফার নির্বাচনে কে এগিয়ে কে পিছিয়ে রইল তার বিশ্লেষন

দেবাশিষ ভট্টাচার্য : অষ্টাদশ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আজ শেষ হচ্ছে। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারের আজ শেষ দিন। গত কয়েক মাস যাবত এই নির্বাচনকে ঘিরে বিবিধ কার্যকলাপের আজ শেষ দিন। এরকম নির্বাচন রাজ্যের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। একে তো এসআইআর আবহে ২৭ লক্ষ ভোটার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চিত হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন অবাধ সুষ্ঠু হিংসামুক্ত নির্বাচন করতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিচ্ছে। যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে যারা আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাজ্য চালানোর দায়িত্ব হাতে নিতে চলেছেন বা কাদের হাতে আমরা এই দায়িত্ব তুলে দিচ্ছি তাদের কিছু কিছু বিষয়ে একবার দেখে নেওয়া যাক। আমরা কাদের নির্বাচিত করতে চলেছি।

এই দফায় মোট ১৫২টি আসনের জন্য লড়াইয়ে নেমেছেন ১৪৭৫ জন প্রার্থী। নমিনেশন জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে—অপরাধমূলক পটভূমি, আর্থিক সামর্থ্য এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে এই নির্বাচনী লড়াই যথেষ্ট বৈচিত্র্যময়। আরো অনেক বিষয় আছে তবে এই বিশ্লেষণ শুধু এই তিনটি বিষয়ের উপরই রাখার চেষ্টা করা হবে। কারণ দেখা গেছে সাধারণ মানুষ এই তিনটি বিষয়ে বেশি আগ্রহী হয়।

লিঙ্গভিত্তিক অংশগ্রহণ :
মোট প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ পুরুষ এবং প্রায় ১৩ শতাংশ নারী। সংখ্যার বিচারে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ এখনও সীমিত হলেও আগের তুলনায় তা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অপরাধমূলক পটভূমি-
হলফনামা অনুযায়ী, প্রায় ৩৯ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে এক বা একাধিক ক্রিমিনাল কেস রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪৫ জন ( ২৩ শতাংশ) প্রার্থীর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। যেমন হিংসা বা জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলা। তবে প্রায় ৭৭ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক মামলা নেই, যা নির্বাচনে ‘ক্লিন ইমেজ’ প্রার্থীদের উপস্থিতিকেও নির্দেশ করে। যার মধ্যে ২৯৪ জনের বিরুদ্ধে সিরিয়াস ক্রিমিনাল কেস আছে। ১৯ জনের বিরুদ্ধে খুন সংক্রান্ত ১০৫ জনের বিরুদ্ধে খুন করার চেষ্টা এবং ৯৮ জনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন , তার মধ্যে ৬ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আছে। ইলেক্টোরাল সিস্টেমকে রিফর্ম করার জন্য ১৩ ই ফেব্রুয়ারি ২০২০ সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল সমস্ত রাজনৈতিক দলকে কারণ দর্শাতে হবে কেন এই ধরনের প্রার্থীদের নমিনেশন দেওয়া হয়, কেন এদের বাদ দিয়ে অন্যদের প্রার্থী পদ দেওয়া হয় না! রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ছিল যাদের নমিনেশন দেওয়া হয় তাদের জনপ্রিয়তা, সামাজিক কাজকর্ম করার নিরিখে এবং সবথেকে বড় কথা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে যে কেস দেওয়া হয় সেগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কোন রাজনৈতিক দলেরই সেরকম কোন সদিচ্ছা দেখা যায়নি।।
আর্থিক চিত্র-
প্রার্থীদের আর্থিক অবস্থার ক্ষেত্রে বৈষম্য স্পষ্ট। ১৪৭৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩০৯ জন কোটিপতি। প্রায় ১৩ শতাংশ প্রার্থী কোটিপতি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যাদের সম্পদের পরিমাণ ৫ কোটিরও বেশি। অন্যদিকে প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রার্থীর সম্পদ ১০ লক্ষ টাকার নিচে। গড় সম্পদ প্রায় ২.৫ থেকে ৩ কোটি টাকার মধ্যে। একই সঙ্গে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ প্রার্থীর ওপর ঋণের বোঝাও রয়েছে। প্রথম দফর এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৪৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০৬ জন হচ্ছে কোটিপতি, বিজেপির ১৫২ জনের মধ্যে ৭১ জন কোটিপতি, কংগ্রেসের ১৫১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫০ জন কোটিপতি, সিপিআইএমের ৯৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৪ জন কোটিপতি। যদি গড় সম্পত্তির হিসেব দেখা যায় বিজেপির ১৫২ জন প্রার্থীর ২.৫৭ কোটি, তৃণমূল কংগ্রেসের ১৪৮ জন প্রার্থীর ৫.৭০ কোটি। কংগ্রেসের ১৫১জনের ২.০৬ কোটি, সিপিআইএমের ৯৮ জনের ৯২.৪২ লক্ষ্য টাকার গড় সম্পত্তি।
শিক্ষাগত যোগ্যতা-
শিক্ষার ক্ষেত্রে মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রায় ৫৬ শতাংশ প্রার্থী স্নাতক বা তার বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন। প্রায় ৩০ শতাংশ প্রার্থী মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্তরের, এবং প্রায় ১৪ শতাংশ প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা তারও নিচে। উল্লেখযোগ্য এদের মধ্যে ২৯ জন সবে স্বাক্ষর হয়েছে আর ১৪ জন একেবারেই নিরক্ষর। সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের যদি বয়সভিত্তিক দেখা যায় ৪৫০জন প্রার্থীর বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ৭৮১ জন ৪১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। ২৪২ জন ৬১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে। দুজন প্রার্থীর বয়স ৮০ বছরের উপরে।
সামগ্রিক প্রবণতা
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বড় রাজনৈতিক দলগুলির প্রার্থীদের মধ্যে সম্পদের পরিমাণ ও অপরাধমূলক মামলার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে ছোট দলগুলো প্রার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা কম।
প্রথম দফার নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রোফাইল স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে রাজনীতিতে অর্থনৈতিক শক্তি ও সামাজিক প্রভাব এখনও বড় ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি শিক্ষিত ও নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারী প্রার্থীদের উপস্থিতিও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যদিও তা এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। তবে সব দলের প্রার্থীকেই মিলিয়ে দিয়েছে তীব্র দহন। রোদ থেকে বাঁচতে সকলের রংবেরঙের টুপি মাথায় গলা ভেজাতে হচ্ছে ওআরএস বা ডাবের জলে।

আজ এই শেষ বেলায় তীব্র গরম তপপ্রবাহ ও ভয়ংকর আদ্রতার দাপটে মানুষের যখন হাঁসফাঁস অবস্থা তখন হয়তো তারা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে যখন চারিদিকে এই মাইক ব্যান্ড বাজানোর ভয়ংকর আওয়াজ, ডিজে বাজিয়ে কুৎসিত নাচ, , রাস্তাঘাটে চিৎকার চেঁচামেচি, মিছিল, দেওয়াল দখল রাস্তা দখল প্রচার নিয়ে হিংসা খুন মারপিট থেমে যাবে। টিভি সোশ্যাল মাধ্যম খবরে কাগজের যুক্তি পাল্টা যুক্তির কুকথার লড়াই, নির্বাচন কে সামনে রেখে কিছু বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির চরম অধঃপতন, গালাগালির উত্তাপ নিস্তেজ হয়ে আসবে। ঠিক এই সময় ভোটারদের দায়িত্ব অপরিসীম।

এই পরিস্থিতিতে ভোটারদের সামনে একদিকে যেমন রয়েছে নানা পটভূমির প্রার্থী, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারা আমাদের দায়িত্ব নেবে নাকি আমরা কাদের উপর আমাদের তথা রাজ্যের দায়িত্ব ছাড়বো। সচেতন ভাবে সেটা নিজেকেই ঠিক করতে হবে। একটা ভুল বোতাম টেপা যেন ভবিষ্যতে আফসোস না করতে হয়। তখন ভাগ্যের দোষ দিলে হবে না।

** তথ্য- ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন ওয়াচ এন্ড অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস।